মোট ওয়েবসাইট প্রদর্শক

Flag Counter

Popular Posts

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

এই ব্লগে অনুসন্ধান করুন

সর্বশেষ সংবাদ

আমাদের সম্পর্কে

কোভিড-19

শেষ বিকেলের আলোয় তুমি- লিখেছেন- মোঃ আমিরুল ইসলাম (শিপন)

এটি শেয়ার করুন:

শেষ বিকেলের আলোয় তুমি

                                                           লিখেছেন- মোঃ আমিরুল ইসলাম (শিপন), পাবনা।

পাকশি রেলওয়ের সদর দপ্তরের এই এলাকাটি খুব নিরিবিলি আর শান্ত। বিভিন্ন গাছ-গাছালিতে ঘেরা আর মায়াবী পরিবেশ। অজস্র পাখির কলকাকুলীতে মুখরিত প্রকৃতি, পথের দুপাশে নাম না জানা অগণিত বনফুলের সৌরভ আমদিত দিকপ্রান্ত। প্রজাপতির বাহারী রূপ যেন অস্পরাকেও হার মানায়। এমনি এক মায়াবী পরিবেশে হাটছি দুজনে। শ্রাবনের মেঘের বৃষ্টিতে ধুয়ে সমস্ত বৃক্ষপুঞ্জ স্নিগ্ধ সজিব দেখাচ্ছে। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নদীর তীর ঘেষে একটি পাথরের উপর বসি। সামনে যৌবনহীন মড়া পদ্মার ধু ধু বালুচর। আমাদের পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে বৃটিশ আধুনিক স্থাপত্বের অনুরূপ নিদর্শন হাডিং ব্রিজ লালনশাহ সেতু।

রিয়াকে আজ আকাশি রংয়ের জিন্স খয়েরি ফতুয়ায় বেশ মানিয়েছে। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচরানো, সেই সাথে মুখে হালকা মেকাপ দিয়েছে।
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। চোখে সেই পাগলাটে আর বেপরোয়া একটা ভাব। হঠাৎ করে অতিরিক্ত গাম্ভির্য্য আমাকে ভেতরে ভেতরে ভাবিয়ে তোলে।

আমি নরম সুরে প্রশ্ন করি, “রিয়া তুমি আমায় কিছু বলতে চেয়েছিলে?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রিয়া বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে বলেসৈকত, এই জায়গাটি কি তোমার পূর্ব পরিচিত?”
আমি বলিহ্যাঁ
প্রত্যুত্তরে বলে, “জায়গাটি বেশ নির্জন আর শান্ত। প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য্য যেন নিজ নিজ হাতে সাজিয়ে দিয়েছে।ওর স্বাভাবিক আচরণ দেখে আমি অবাক হই।

মাঝে মধ্যে বুন পাখির ডাক আর দুর গায়ের অস্পষ্ট কোলাহল ছাড়া পরিবেশটা সত্যিই একদম নির্জন ওর মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি সুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ। আমার মনে পড়ে, যায় ওর বাবার সাথে পরিচয়ের ঘটনা।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের ভেতরে সন্ধ্যার আলো আধারির খেলাকে ছাপিয়ে তখন রাতের অন্ধকার আসন্ন। হঠাৎ পেছন থেকে অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠি। ফিরে দেখি একজন মধ্যবয়ষ্ক লোক।
লোকটি বলল, “বাবা তুমি কি এখানকার স্থানীয়? উত্তর হ্যাঁ। শুনে বলল- ‘এই হাসপাতালে একজন রোগী ভর্তি করতে এসেছিলাম।
রোগী অর্থাৎ আমার মেয়ে, পাশের এই গাড়িটির মধ্যে বসা ছিল, হঠাৎ মেয়েটি কোথায় যে গেল?”
আমার মনে পড়ল পুকুর পাড়ে বসে থাকা মেয়েটির কথা। তার সুন্দর চেহারার মাঝে অদ্ভুত চাহুনী আর আগোছালো পোশাক দেখে আমি ক্ষণিকের জন্য থমকে দাড়িয়েছিলাম। লোকটিকে সঙ্গে করে দ্রুত পুকুর পারে পৌঁছে দেখি মেয়েটি এখানেই বসে আছে।
লোকটিকে দেখে মেয়েটি চোখ দুটো গোল করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বলল- “বাবা তুমি এখন আসছো?”
আমার আর সন্দেহ রইলনা মেয়েটি আসলে মানসিক ভাবে অসুস্থ্য। একদিনের পরিচয়েই ওর বাবার সাথে বেশ খাতির হয়ে গেল। আশ্চর্য্য জনক ভাবে রিয়ার মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণ ওর বাবা কৌশলে এড়িয়ে যায়। ডাক্তারের সাথে পরামর্শের সময় কোন অজুহাতে আমাকে বাহিরে পাঠিয়ে দিত। আমিও তাদের নিজস্ব ব্যাপার বলে এড়িয়ে যেতাম।

আমার নিরবতার কারণেই রিয়া পাশ থেকে বলে ওঠে-“কি ব্যাপার তুমি কি বোবা হয়ে গেলে?
আমি বলিনা এমনি একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম।রিয়া বেশ কৌতুক করে বলল- “এমন সুন্দর আর নিরিবিলি পরিবেশে নিশ্চই মানুষপটে স্বপ্নীল কেউ এসেছিল।আমি প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলি- “রিয়া তুমি কিন্তু আমায় কিছু বলতে চেয়েছিলে।
হঠাৎ ওর মুখটা বেশ বলিন হয়ে গেলো।
স্বগত কন্ঠে বলল- “আমার বিষয়ে তোমার অনেক কৌতুহল। আমিতো এসেছিলাম এখানে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে, যার বর্তমান ভবিষ্যৎ ছিলো গাঢ়ো অন্ধকারে ঢাকা। আমার সুস্থ্যতার পথে বাবার সাথে তোমাকে প্রায়ই দেখতাম। প্রথম অবস্থায় তোমার সাথে কথা বলতে বেশ বিব্রত বোধ করতাম। অপরিচিত একজনের আমার চিকিৎসা, ভালমন্দ ইত্যাদি বিষয়ে কৌতুহল আমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতো। আর সেই সাথে আমার কিছু অতীত স্মৃতি মনে হলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়তাম।
হঠাৎ রিয়া অপ্রত্যাশিতভাবে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে বেশ কর্কষ কন্ঠে বলল- “সৈকত এখন আমার আর এক মুহুর্তও থাকতে ইচ্ছা করছেনা। বলে দ্রুত হেঁটে গাড়িতে এসে বসল।  বেশ কিছুক্ষণ পর নিচু স্বরে রিয়া আমায় বলল সৈকত- ‘তুমি আমাকে তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলে।
আমি ছোট্ট করে বললাম- “কখন যাবে?” রিয়া বলল- “ছাত্রছাত্রীদের পদভারে ক্যাম্পাস যখন মুখর থাকবে। 
আজ সত্যিই ক্যাম্পাসের বিশাল চত্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের সরব উপস্থিতি। আমি রিয়াকে সঙ্গে করে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসের সকল ডিপার্টমেন্ট, কলেজ ক্যান্টিন ঘুরে ঘুরে দেখাই। আমরা ক্লান্ত হয়ে অর্থনীতি ডিপার্টমেন্টের সামনে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসি। আমি লক্ষ করি কান্না লুকানোর ব্যার্থ চেষ্টা রিয়া করে যাচ্ছে। অশ্রু সাগর হতে দুচোখ বেয়ে নেমে আসছে ওর নোনা জল। রিয়া বলতে শুরু করে- “আমার বেড়ে ওঠা বৃত্তশালী পরিবারে জীবনের সবকিছুতেই শুধু পাওয়ার হিসাবে ব্যস্ত ছিলাম। না পাওয়ার কোন দুঃখ ছিলনা। স্কুল কলেজ পেড়িয়ে চলে এলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।  
 আমার চিন্তা চেতনার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনুভব করতাম কিছু না পাওয়ার  শুন্যতা মনে হতো আধুনিক আর আভিজাত্যের মোড়কে মোড়া সব কিছুই কংক্রিটের মতোই নির্জীব আর নিথর কিছু সুন্দর পোশাকের মানুষ গুলোর বাহিরের আবরণ টাই শুধু সুন্দর। কৃত্রিম ভালবাসা সৃষ্টির অভিনেতা চারপাশে। ভালোবাসায় অবিশ্বাসের উৎকট গন্ধ। ভালোবাসা তীর্থক্ষণিক মধুকরের আনাগোনা। যারা ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় আর তৃষ্ণা মেটায় নিজ প্রয়োজনে। সহপাঠি বন্ধুদের বন্ধুত্বের মায়াজালে একই আচরণ। তথাকথিত এই সত্য সমাজের আচরণে আমার ভেতরে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ সমূহ ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। আমি বার বার পরাজিত হতে থাকি আমার নিজস্ব মূল্যবোধ আর নৈতিকতার কাছেসৈকত, ঐশ্বরিক যে ভালবাসার দাবি সে তো হৃদয়ে। কিন্তু সমাজের কথায় আচরণে তা শুধুই দৈহিক। দুঃসহ দহনে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে আমার অন্তর। জীবনের চারিপাশের পরিমন্ডল হতে থাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র। আমার কথা আচরণ হতে থাকে অপ্রকৃতস্থ। অস্বাভাবিক ভাবে লোপ পেতে থাকে আমার স্মৃতিশক্তি।
সৈকত নির্বাক চোখে রিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে পায় উচ্চবিত্ত ধনী সমাজের একজন মানুষের দুঃসহ যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি। অসুধোয়া কন্ঠে রিয়া বলে- “তুমি যখন আমার জন্যে প্রতিদিন ফুল আনতে, তখন মনে হতো এটাও একটি অভিনয়। তাই কারণে অকারণে অপমান করতাম। কিন্তু তোমার আহত মনটা তোমার নিস্পাপ চাহুনীতে মনে হতো তুমি তেমনটা নও। এটা শুধুই সহমর্মিতা, নির্মাল ভালোবাসার নিদর্শন। যেখানে সাময়িক তৃপ্তির নিলজ্জি মিথ্যা অভিনয় নেই। তোমার সেই পবিত্র দৃষ্টি আমার হৃদয়ে সৃষ্টি করে অপার্থিব এক ভালোবাসা। যা শুধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায়।
টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতির লুকোচুরিতে সৈকতের একটি নতুন দিনের সূচনা হয়।
ক্লিনিক থেকে রিয়াকে রিলিজ দেবে আজ। কোথায় যেন বিচ্ছেদের ক্ষীন সূর শুনতে পায়। হঠাৎ দেখে ক্লিনিক থেকে বেড় হয়ে রিয়া এদিকেই আসছে। সৈকত একটি অচেনা ভাললাগার মিষ্টি আবেশ অনুভব করে। কিন্তু পরক্ষনেই নিজেকে শাসন করে। মধ্যবিত্তের মধ্যবিন্দু থেকে স্বপ্ন শুধুই কল্পনা বিলাস।
রিয়া তার কল্পনায় বাস্তবতার আচর দিয়ে বলে- “সবকিছু তুচ্ছ করে তোমার এই অকৃত্রিম ভালোবাসার পরশে নিজেকে শুদ্ধ করতে চাই। অনিবার্য এক অপমৃত্যু হতে জন্ম দিতে চাই শ্বেত-সুভ্র নিঃস্বার্থ দুটি হৃদয়ের এক নির্মল ভালোবাসা।
সমাপ্ত

লেখক পরিচিতিঃ 
নামঃ মোঃ আমিরুল ইসলাম (শিপন) 
ঠিকানাঃ গ্রাম- আটুয়া, ডাকঘর- পাবনা 
থানা- পাবনা সদর, জেলা- পাবনা। 
-মেইলঃ printtexepz@gmail.com










সম্মানিত পাঠক,
সংবাদবিডি ২৪ অনলাইন পত্রিকার গল্প, উপন্যাস ও কবিতা বিভাগে প্রকাশের জন্য আপনার লেখা আহ্বান করা যাচ্ছে। উপযুক্ত হলে আপনার লেখাটিও প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। আগ্রহীরা উক্ত কবিতা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরন করতে পারেন। ই-মেইল-  songbadbd24.net@gmail.com অথবা আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ করতে পারেন। ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইটের পাঠক হওয়ার জন্য।

এটি শেয়ার করুন:

উপন্যাস

একটি মন্তব্য করুন:

0 মন্তব্য: