মোট ওয়েবসাইট প্রদর্শক

Flag Counter

Popular Posts

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

এই ব্লগে অনুসন্ধান করুন

সর্বশেষ সংবাদ

আমাদের সম্পর্কে

কোভিড-19

ছোটগল্প "বান্টি"

এটি শেয়ার করুন:

ছোটগল্প "বান্টি"

 লিখেছেন- ফাহিমা আক্তার,
                             কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

বান্টি আমাদের পোষা কুকুরের নাম।ওর জন্ম আমাদের বাড়িতেই।একদিন রাতে প্রেগনেন্ট বান্টির মা আমার বড় ভাইয়ের পিছু পিছু আমাদের বাড়িতে আসে।ভাই পথে অনেক বার ঢিল ছুঁড়ে,গাছের ডাল ভেঙে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই পিছু ছাড়তে নারাজ। অগত্যা ভাই বান্টির মাকে নিয়েই বাড়ি এল।

আব্বা ভাইয়ের উপর খুব রাগ করলেন । আব্বাও লাঠি দিয়ে ভয় দেখিয়ে অনেক বার তারানোর চেষ্টা করলেন।কিন্তু বান্টির মা আব্বার লাঠিকেও ভয় পেল না।বরং আমাদের উঠানের মাঝ বরাবর চার পা ছড়িয়ে বাড়ন্ত পেট খানা সামনে মেলে দিয়ে শুয়ে পড়ল ।তারপর আব্বার দিকে মায়া মায়া চোখে চেয়ে রইল জিহ্বা বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে ।

আব্বা বান্টির মাকে কিছু আর বললেন না। শুধু আমাকে কিছু খাবার দিতে বলে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। আমিতো মহা খুশি। তারাতারি রান্না ঘরে গিয়ে পুরনো থালায় করে ভাত আর কয়েক টুকরা মাংস এনে সামনে দিলাম। চেটে পুটে খেয়ে বান্টির মা চোখ বুজে আরামসে ঘুম দিল।

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের বাড়িতে কেউ খুব একটা কুকুর পছন্দ করে না। দেখলেই লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। কারণটা বান্টির মা বাড়িতে আসার পর জানতে পারি। আর আমার কারণেই নাকি এমন করা হয়। আমি তো অবাক! কারণটা আমি অথচ এর বিন্দু বিসর্গ পর্যন্ত কিছুই আমার জানা নেই। শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল !

ভাইকে চেপে ধরতেই ভাই যা বলল শুনেতো আমি থ বনে গেলাম। তখন নাকি আমার বয়স দেড় কি দুই। গুটিগুটি পায়ে সারা বাড়িময় হেঁটে বেড়াই। আধবুলি কথাতে সবাইকে মাতিয়ে রাখি। সেই সময় আব্বার পোষা একটা কুকুর ছিল। নাম টাইগার। আব্বা নিজ হাতে টাইগারকে খেতে দিতেন গোসল করিয়ে দিতেন। টাইগার কে তিনি এতই ভালোবাসতেন যে আলাদা করে আব্বা একটা চিনা মাটির থালা পর্যন্ত কিনে এনে ছিলেন টাইগারকে খাবার দেবার জন্য!

টাইগারের সাথে আমারও নাকি অনেক ভাব ছিল। সব সময় আমার সাথেই থাকত। আমার গুটি পায়ের হাঁটার সাথী ছিল টাইগার। একদিন মা আমাকে দুধ ভাত মাখিয়ে খাওয়াচ্ছিলেন। এমন সময় আব্বা কোথাও বেরুবেন। কিন্তু চশমাটা খুজে পাচ্ছিলেন না। মা কে ডাকতেই মা আমাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে ঘরের ভেতরে যান চশমা খুঁজতে। টাইগার বসে ছিল উঠানেই। হঠাৎ আমার চিৎকার শুনে আব্বা মা বাইরে এসে দেখেন টাইগার আমার নাক মুখ কামড়ে ধরে আছে। দাঁত ঢেবে গিয়ে টাইগারের চোয়াল বেয়ে টপটপ করে রক্তের ফোটা ঝরে পড়ছে। রক্ত দেখে মা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারান। আব্বা হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে উঠানে পড়ে থাকা রড দিয়ে টাইগার কে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এক সময় টাইগার আমাকে ছেড়ে দেয়। তারপর ছুটে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়।

আমাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেয়া হয়। আমার মুখে কয়েকটা সেলাই পড়ে। চৌদ্দ দিন ধরে নিতে হয় চৌদ্দটি ইঞ্জেকশন। ঘটনাটি খুব ছোট বেলার হওয়ায় আমার মুখের সেলাইয়ের দাগ গুলো বর্তমানে মিলিয়ে গেছে। তবে কপালের ডান দিকে ছোটমত একটা দাগ এখনও কিছুটা বুঝা যায়।
ঘটনার সাত দিন পর রাস্তার পাশে মৃত টাইগারকে পাওয়া যায়। টাইগারকে হারিয়ে আব্বা খুব ভেঙ্গে পড়েন। আবার কষ্টও পান টাইগার আমাকে এভাবে আঘাত করেছে বলে। এরপর থেকেই কোন কুকুর বেড়াল প্রবেশে আমাদের বাড়িতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ।

যাইহোক বান্টির মা সেই নিষেধাজ্ঞা কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমাদের বাড়িতেই রয়ে গেল বহাল তবিয়তে। তিনবেলা মাছ মাংস খেয়ে আর উঠানে ঘুমিয়ে থেকে ওর শরীর স্বাস্হ্য বেশ ভালই হল। এর কয়েক দিন পর জন্ম হল বান্টির। মার পেট থেকে জন্ম নেয়া একমাত্র ছানা বান্টি। নাদুসনুদুস মেটে লাল নরম লোমের গুলুমুলো টাইপের বান্টিকে দেখে আমি আর ভাই যারনাপাই খুশি। বান্টি নামটি ভাইয়ের দেয়া । আর সেই থেকে ওর মায়ের নাম হয় বান্টির মা।

বান্টির জন্মের কিছুদিন পর আচমকা মারা যায় বান্টির মা। মায়ের মৃত্যুর পর বান্টির উপর আব্বা, মা সহ আমাদের সবারই কেমন মায়া পড়ে যায়। বান্টিও আমাদের সবার নেউটা হয়ে যায়। আমাদের সবাইকে সে আলাদা ভাবে চিনতে পারে। আমরা কে কখন বাড়ি থেকে বের হই কিংবা আমাদের বাড়িতে ফেরার সময়টা কাটায় কাটায় বান্টির মুখস্হ। আমাদের আচার আচরণ কথা বার্তা গুলোও বান্টির নখদর্পনে। 

আমি সবে এস এস সি পাশ করে স্হানীয় কলেজে ইন্টারমিডিয়েট এ ভর্তি হয়েছি। মাধ্যমিকে গার্লস স্কুলে পড়েছি বলে কলেজে ছেলেদের সাথে ক্লাস করতে কেমন যেন অস্বস্হি লাগে। একা একা কলেজে যেতেও ভাল লাগে না। তাই কোন দিন আব্বা আবার কোন দিন ভাই আমাকে কলেজে নিয়ে যায় নিয়ে আসে।

কয়েক দিন এভাবে চলার পর যখন একটু ইজি হয়ে গেলাম তখন একা একাই কলেজে যেতে শুরু করি। কিন্তু আমার বডি গার্ড হিসেবে বান্টি অনেকটা যেচেই দায়িত্ব পালন করতে থাকে। আমি রেডি হয়ে কলেজের জন্য যখন বের হই তখন বান্টিকে দেখি রাস্তার ধারে বসে বসে ঝিমায়। যখনি আমি রিক্সায় উঠি এবং রিক্সা চলতে শুরু করে ঠিক তখনি তড়াক করে উঠে হঠাৎ ই আমার রিক্সার পিছু নেয়।

রাস্তায় দৌড়ে দৌড়ে বান্টি কখনও আমার রিক্সার আগে আবার কখনও পিছে দৌড়ে ছুটে। কলেজে পৌছে ক্লাস রুম পর্যন্ত পৌছে দিয়ে তবেই বিদেয় হয় । প্রতিদিন আমি ক্লাস শেষ করে গেটের বাইরে এসে দেখি রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে বান্টি।ফেরার সময়ও ঠিক একই ভাবে আমি রিক্সায় আর বান্টি পেছনে দৌড়ে বাড়ি ফিরে ।

কোন দিন ক্লাস করতে দেরি হয়ে গেলে বান্টি আমার ক্লাস রুমের সামনে গিয়ে বসে থাকে। আমি বের হয়ে আসলে আমার চারপাশে চক্কর খায় আর গেউ গেউ শব্দ করে।হয়তো আমার দেরির কারণটা জানতে চায়। তখন আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তবেই শান্ত হয়। 

কয়েক দিনেই বান্টিকে কলেজের সবাই মুটামুটি ভাবে চিনে গেছে। অবশ্য মাঝে মাঝে বান্টিকে নিয়ে সহপাঠীদের কাছ থেকে আমাকে টিপ্পনীও শুনতে হয়। আমি কারো কথা তেমন গায়ে মাখি না। বরাবরই আমি চুপচাপ টাইপ। কলেজে আমার তেমন কোন বান্ধবীও নেই। আমার কাছের বান্ধীরা সবাই অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। যদিও গার্লস স্কুলের কয়েক জন সহপাঠী এখানে ভর্তি হয়েছে কিন্তু বিভাগ ভিন্নতার কারণে ওদের সাথে আমার খুব একটা দেখা সাক্ষাত হয় না।

একদিন ক্লাস শেষে কমন রুমে যাবার সময় স্কুলের বান্ধবী মীরা এসে পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে। পেছন ফিরে মীরাকে দেখে আমিও লাফিয়ে উঠি। প্রিয় বান্ধবীকে পেয়ে ভাল লাগায় মন ভরে যায়। কথায় কথায় জানতে পারি মীরাও এখানে ভর্তি হয়েছে আমার বিভাগেই । আর অসুস্থতার জন্য এতদিন ক্লাসে আসতে পারেনি।

পুরাতন বান্ধবী কে পেয়ে আমার কলেজের নিরানন্দ দিন গুলোর ইতি ঘটে। আগে যেমন ক্লাস শেষে অথবা অফ পিরিয়ডে সুজাসুজি কমন রুমে গিয়ে চুপচাপ কোনার দিকে বসে পরবর্তী ক্লাসের অপেক্ষায় থাকতাম। কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলতাম না। মীরা আসাতে সব পাল্টে গেল। দুজনে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সারাক্ষণ গুটুর গুটুর করে কথা বলি। কখনও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। ঝাল মুড়ি খেতে খেতে হাসা হাসি করে একজন অন্যজনের উপর ঢলে পড়ি। অফ পিরিয়ড গুলি আর আগের মত বোরিং লাগে না।

আমাদের কলেজে গেট দিয়ে ঢুকতেই রাস্তার দু পাশে বেশ কয়েকটা মোটা মোটা মেহগনির গাছ। একটু ঘন গুছের। একহারা অনেক খানী উপরের দিকে উঠে গেছে। পাতা গুলো ঝোপালো। ফলে এখানে সূর্যের আলো খুব একটা পৌছায় না। একটু সামনে এগুলেই ডানে শহীদ মিনার চত্বর। চত্বরের পেছনে বড় একটা পুকুর। বায়ে হাঁটা রাস্তায় পর পর তিন তলা ও চার তলার দুটি কলেজ ভবন।

ভর্তি হবার পর থেকেই দেখছি মেহগনি গাছের নিচে একটা ভাঙ্গা রিক্সা পড়ে আছে। রিক্সার সামনের চাকা ভাঙ্গা। হেণ্ডেলটা কে বা কারা রশি দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে। পেছনের চাকা, সিট, হুড সবই ভাল আছে। চাইলে কেউ অনায়াসে বসে থাকতে পারে। প্রতিদিন দেখি একদল ছেলেপিলে এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে।

একদিন কলেজের গেট দিয়ে ঢুকছি বরাবরের মত বান্টিও আমার সাথে আছে। লাজুকতার জন্য তখনও আমি হাঁটার সময় কোন দিকে তাকাতে পারি না। চোখ নামিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে একমনে হেঁটে চলি। হঠাৎ একটা ছেলে এসে আমার গতি রোধ করে দাঁড়ায়। আমি চমকে ছেলেটার দিকে তাকাতেই ছেলেটা বলে উঠে-"ইমতিয়াজ ভাই আপনার সাথে কথা বলবে একটু দাঁড়ান"। তারপর ছেলেটা সামনে থেকে সরে যায়।

নামটা কেমন চেনা চেনা লাগে। মনে পড়ে সেদিন কমন রুমে মেয়েরা ইমতিয়াজ ভাই নামের কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের কথা বলাবলি করছিল। তবে ইনিই তিনি? কিন্তু তিনি কেন আমার সাথে কথা বলবেন ঠিক মাথায় আসছে না!

এমন সময় সেই ভাঙ্গা হুট তোলা রিক্সা থেকে লম্বামত একটা ছেলে লাফিয়ে নেমে হেঁটে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। সামনের সব কিছু কেমন ঝাপসা লাগে।
"কেমন আছ শবনম?"

হায় হায় ছেলেটা দেখি  আমার নামও জানে!

কোন রকম মাথা ডান দিকে হেলিয়ে ভাল আছি বলে ছেলেটার দিকে ভালমত তাকাতেই দেখি ছেলেটাকে আমি চিনি। নবীন বরণের দিন ছেলেটাকে আমি দেখেছি। শত শত ছেলে মেয়ের মাঝে ছেলেটাকে মনে রাখার আরেকটা কারণ হল সেদিন অনুষ্ঠানের মাঝে চেয়ার ছেড়ে একবার ওয়াসরুমে যাই। ফিরে এসে দেখি আমার চেয়ার তখনও খালি আছে। যেখানে উঠা মাত্র চেয়ার দখল হয়ে যাচ্ছিল সেখানে এতক্ষণ পরেও চেয়ারটা খালি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। পরে পাশের জনের কাছে জানতে পারি ছেলেটাই নাকি আমার সিটে কাউকে বসতে দেয়নি।

ইমতিয়াজ ভাইকে দেখে আমার ভয় কিছুটা কমে গেল। তবে পাশে থাকা বান্টি গলায় কেমন গর গর শব্দ করতে শুরু করে। কোন বিপদের আঁচ করতে পারলে বান্টি সচারাচর এমন শব্দ করে ।

" কলেজের কেউ কিছু বললে আমাকে জানাবা,বুঝছ?"
আমি আবারও মাথা হেলালাম। তারপর হাতে থাকা ফুল আর একটা প্যাকেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ইমতিয়াজ ভাই বললেন-"এটা রাখ তোমার জন্মদিনের গিফট! কাল পার্টির কাজে নেতার কাছে যেতে হবে। আমি থাকতে পারব না। তাই একদিন আগেই দিলাম।"

আমিত আকাশ থেকে পড়লাম! ভেবে পেলাম না তিনি কেন আমাকে এভাবে গিফট দিবেন। আর আমিই বা কেন নেব। আমি একটু পিছিয়ে এসে হাত নেড়ে অসম্মতিসূচক কিছু একটা বলতে যাই। আর ওমনি দেখি বান্টি গর গর শব্দ বাড়িয়ে দিয়ে ইমতিয়াজ ভাইয়ের প্যান্টের নীচের দিকে কামড়ে ধরেছে। হঠাৎ এমন আক্রমনে ইমতিয়াজ ভাই হতবিহবল হয়ে পড়েন। তারপর পা ঝাড়া দিয়ে বান্টিকে ছাড়াতে চেষ্টা করে। দুই বারের বার সফলও হন। কিন্তু বান্টি নাছোড় আবার কামড়ে ধরার চেষ্টা করে। এবার তিনি দৌড় লাগান। বান্টিও পেছন পেছন দৌড় লাগায়। শহীদ মিনারের বেদীতে গিয়ে ইমতিয়াজ ভাই হুঁচট খেয়ে পড়ে যান। তড়িঘড়ি উঠে পিছন ফিরে বান্টির অবস্থান দেখে আবার দৌড়াতে থাকে এবং ঝপাৎ করে পুকুরের পানিতে গিয়ে পড়েন। বান্টিও দৌড়াতে দৌড়াতে পুকুরের পাড়ে গিয়ে ইমতিয়াজ ভাইয়ের দিকে চেয়ে গেউ গেউ শব্দ করতে থাকে।
 হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমি যেন মূর্তি বনে গেলাম। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম শুধু। মীরা এসে কখন আমার পেছনে দাঁড়িয়েছে জানি না। ওর হাত আমার কাঁধে টের পেতেই যেন বাস্তবে ফিরে এলাম। দেখলাম ইমতিয়াজ ভাই তখনও পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। বান্টি গেউ গেউ করছে। আর ইমতিয়াজ ভাইয়ের চেলাপেলারা দৌড়ে যাচ্ছে হয়তো তাকে উদ্ধারের জন্য। আশেপাশে যারা ছিলো তারা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে ঘটনা বুঝার চেষ্টা করছে।

আমি দৌড়ে বান্টির কাছে গেলাম। ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শান্ত করতে পারছিলাম না। তারপর মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে ওকে নিয়ে দ্রুত বাড়ির পথ ধরলাম। আমার মনে ভয় হতে লাগলো বান্টিকে হয়তো ওরা কিছু একটা করে ফেলবে। তাই এখান থেকে সরে যেতে হবে। সামনে খালি রিক্সা পেয়ে সেটাতেই উঠে পড়লাম। আজ বান্টিকেও রিক্সায় উঠিয়ে নিলাম।

এরপর পর পর দু দিন কলেজ কামাই করি। মায়ের ধমকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে আবার তিন দিনের দিন কলেজে রওয়ানা হই ধুরু ধুরু বুকে।বান্টিকে বুঝিয়ে বাড়িতে রেখে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।ইমতিয়াজ ভাইকে কিভাবে ফেস করব সেই চিন্তায় গত দুরাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি। ক্যাম্পাসে ঢুকতে কি যে ভয় ভয় লাগছিল। সারক্ষণই মনে হচ্ছিল এই বুঝি ইমতিয়াজ ভাই তার দলবল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভেবেছিলাম কলেজের নানান জনে নানান কথা বলবে। সেগুলো কিভাবে ফেস করবো সে কথা ভেবেও কোন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না।

কিন্তু সারাদিন কলেজ থেকেও যখন ওই ঘটনার কোন ফিডব্যাক পেলাম না তখন মনে ভীষণ শান্তি পেলাম। শুধু কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় ঘটনা কি ঘটেছিল মীরা জিগ্যেস করেছিল। আমি এড়িয়ে গেছি। এরপর দেখতে দেখতে দুবছর শেষ হয়ে গেল। ফাইনাল পরিক্ষা দিয়ে পাশও করে ফেললাম। কিন্তু ইমতিয়াজ ভাই এর মধ্যে কোন দিন আর আমার সামনে আসেন নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে উঠেছি। ছুটি ছাটায় বাড়ি যাই। চলে আসার সময় বান্টির জন্য খুব মন খারাপ হয়। বুঝতে পারি বান্টিও কষ্ট পায়। হলে ফেরার দিন আব্বার সাথে বান্টিও স্টেশন পর্যন্ত আসে। আমি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত আব্বা আর বান্টি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

প্রথম বর্ষ শেষ হয়ে দ্বিতীয় বর্ষ যখন শুরু হয়েছে হঠাৎ করেই দু দলের ছাত্র সংঘর্ষের কারনে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধের দিনগুলি বাড়িতে কাটাবো বলে মনোস্থির করি। আসার দিন বাস থেকে নেমে রিক্সায় উঠতে যাব এমন সময় ইমতিয়াজ ভাইয়ের সাথে দেখা। প্রথমে চিনতে পারিনি। হ্যাংলা পাতলা ইমতিয়াজ ভাই এখন একটু মুটিয়ে গেছেন। পেটটা সামনে সামান্য স্ফিত হয়ে গেছে। তবে কন্ঠস্বরে চিনতে অসুবিধা হয় না একটুকুও। সেই দিনের মত সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন", শবনম, কেমন আছ?"
সহাস্যে জবাব দেই" ভাল আছি"!
"বাড়ি ফিরলে? "
"জি"
"আচ্ছা ভাল থেক"- বলেই তরিঘড়ি করে ইমতিয়াজ ভাই চলে গেলেন।

রিক্সায় ফিরতে ফিরতে বান্টির অবয়বটা আমার চোখের পাতায় ভেসে উঠে। বান্টি, ও আমার প্রিয় বান্টি! আজ আর পৃথিবীতে নেই। কয়েক মাস আগে এলাকায় চোরের খুব উপদ্রুত বেড়ে যায়। আশেপাশে অনেক বাড়িতেই প্রতিদিন চুরির ঘটনা ঘটে। কিন্তু বান্টির কারণে চোর আমাদের বাড়িতে ঢুকতে সাহস পায় না। এই পরিস্হিতিতে কে বা কারা ওকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে। আব্বা যখন টেলিফোনে সংবাদটি আমাকে জানায় তখন আব্বার ব্যথাতুর মুখটা আমি স্পষ্টই টের পাচ্ছিলাম। কিছু সময়ের জন্য আমার পৃথিবীটাও যে কিছুটা দোলে উঠেছিল! 

একটু পর বাড়ি ঢোকার পথে কেউ আর মাথা নেড়ে নেচে নেচে আমাকে স্বাগত জানাবে না। আর কেউ আমার আগমনের বার্তা বাড়ির অন্যদের জানাতে গেউ গেউ শব্দ তুলে বাড়ি মাথায় তুলবে না ভাবতেই বুকটা খালি করে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখ জ্বালা করে দু'পাতা ভিজে উঠে!

সমাপ্ত







সম্মানিত পাঠক,
সংবাদবিডি ২৪ অনলাইন পত্রিকার গল্প, উপন্যাস ও কবিতা বিভাগে প্রকাশের জন্য আপনার লেখা আহ্বান করা যাচ্ছে। উপযুক্ত হলে আপনার লেখাটিও পাবলিশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। আগ্রহীরা উক্ত কবিতা ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরন করতে পারেন। ই-মেইল- songbadbd24.net@gmail.com অথবা আমাদের ফেসবুক পেজে মেসেজ করতে পারেন। 
ধন্যবাদ আমাদের ওয়েবসাইটের পাঠক হওয়ার জন্য।

এটি শেয়ার করুন:

গল্প

একটি মন্তব্য করুন:

0 মন্তব্য: