মা, বিড়াল এবং ছোঁ-মারা চিলের গল্প
বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বিড়াল থাকত। এখনও
থাকে। তবে আগের চেয়ে সংখ্যায় অনেক কম। যেহেতু আমার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে
গ্রামে সেহেতু আমি এ ব্যাপারে বেশ ভালোই জানি।
'প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বিড়াল থাকত' কথাটা বলার কারণ হলো, যে বাড়ির
মানুষজন একটু ধনী অথচ এক ঘরে টাইপের কিংবা একটু কৃপণ স্বভাবের অথবা বাড়ির
কর্তা বদমেজাজি সেসব বাড়িতে বিড়াল থাকতে আমি কমই দেখেছি।
আবার যেসব বাড়ির মালিকদের নিজেদের কোন চাষবাসের জমি থাকত না তাদের
বাড়িতে আমি কোনদিন বিড়াল থাকতে দেখিনি। অবশ্য সেসব বাড়িতে কবুতর,
হাঁস-মুরগী দিয়ে বাড়ি ভরা থাকতে দেখেছি।
কবুতর, হাঁস-মুরগী পালনে লাভ আছে। কবুতরের বাচ্চার অনেক দাম।
হাঁস-মুরগীরও ঠিক তাই। বিড়ালও বাচ্চা দেয়। কিন্তু বিড়ালের বাচ্চার কি কোন
বাজারমূল্য আছে? শুধু শুধু বিড়ালকে কেন তারা খাওয়াবে?
সব বাড়িতে বিড়াল না থাকার এটা একটা অন্যতম কারণ। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত
আমার এই ধারণা ছিল। তবে আরও একটু বড় হয়ে খেয়াল করলাম যে, তাঁত বুনিয়ে সংসার
চালায়। সারা বছর কেনা চালের ভাত খায়।
ছোট্ট একটা খুপরি ঘর কিন্তু সে বাড়িতে বিড়াল আছে। তখন থেকে উপলব্ধি হলো, বিড়ালও মানুষ চেনে। এজন্য সব বাড়িতেই বিড়াল থাকে না।
জ্ঞান হবার পর থেকেই আমাদের বাড়িতে দু'তিনটে বিড়াল থাকতে দেখেছি। আমার
দাদীর পিছন পিছন সব সময় একটা না একটা বিড়াল ঘুরে বেড়াতই। খাওয়ার সময় ডানে
একটা, বামে একটা এমনকি পিছনে একটা বিড়াল থাকত।
আর তিন পাশ থেকে শুরু হতো ম্যাও ম্যাও ডাক। নিজে খাওয়ার পাশাপাশি এক
লোকমা দুই লোকমা বিড়ালকেও দিতাম। তবুও ম্যাও ম্যাও ডাক বন্ধ হতো না দেখে
মাঝেমধ্যে খুব বিরক্ত হতাম।
লাঠি দিয়ে দু'একটা হালকা বাড়িও দিতাম। তবে আমাদের বাড়ির বিড়ালগুলোকে
কখনো চুরি করে মাছ, মাংস কিংবা দুধ খেতে দেখিনি। তরকারির পাতিল খোলা রাখলেও
বিড়াল কোনদিন তাতে মুখ দিতো না।
কিন্তু একদিন ব্যত্যয় ঘটে গেল। তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। স্কুল শেষে মাত্র
বাড়িতে এসেছি। দাদী মোটামুটি রেগে ফায়ার হয়ে আছেন। কারণ কী! শুনলাম একটা
বিড়াল কয়েকদিন ধরে চুরি করে তরকারির পাতিলে, দুধের বাটিতে মুখ দেওয়া শুরু
করেছে।
আর সে-দৃশ্য দাদী নিজ চোখে দেখেছেন। এজন্যই সে রাগে ফায়ার হয়ে আছেন।
দাদী একটা বিড়ালকে দেখিয়ে বললেন, 'এইডারে দইরা জঙ্গলে থুইয়ায়।' দাদীর একথায়
মা-চাচিরা একটু অবাকই হলেন।
আর আমরা হলাম ভীষণ খুশি। বিড়ালকে ছালার বস্তায় ভরে বেশ দূরের জঙ্গলে
রেখে আসা এটা আমাদের কাছে তখন ভীষণ আনন্দের কাজ। ছালার বস্তায় ভরার কারণ
হলো- বিড়াল যাতে বুঝতে না পারে যে কোন রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
না হলে এই রাস্তা দিয়ে ঠিকই বাড়িতে চলে আসবে। ভীষণ আনন্দ নিয়ে সমবয়সী
তিনজন মিলে বিড়ালের বস্তা নিয়ে চললাম কবর স্থানের পাশের জঙ্গলের দিকে।
রাস্তা পেরিয়ে ঘন গাছপালা পেরিয়ে এসে এইবার বস্তার মুখ খুলে বিড়ালকে
ছেড়ে দিলাম। বিড়ালটা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সামনেও এগোল না পিছনেও এগোল না। চলে
আসার সময় খেয়াল করলাম বিড়ালটা ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াবী চোখে আমাদের দিকে শুধু
তাকিয়ে আছে।
বেলা তখনো তলিয়ে যায়নি দেখে, রাস্তার পাশের এ পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের সাথে
প্রায় এক ঘন্টা মার্বেল খেলে, মাগরিবের আযানের ঠিক আগে আমরা যখন বাড়ির
ভিটায় পা রাখবো ঠিক তখন খেয়াল করলাম দাদী আমাদের দেখে একেবারে বাচ্চাদের
মতো হাসছেন।
এ হাসির অর্থ তখন আমরা বুঝতে পারছিলাম না। তখন তিনি নিজের হাতের আঙুল
যেদিকে প্রদর্শন করলেন সেদিকে তাকিয়ে আমাদের চক্ষুছানাবড়া। আমরা একে অপরের
দিকে তাকাই।
যে-বিড়ালকে জঙ্গলে রেখে আসলাম, আমরা বাড়ি ফেরার আগেই সে-বিড়াল বাড়িতে এসে হাজির! আর তাই দেখে দাদী খুশীতে বাচ্চাদের মতো হাসছেন।
সে-সময়ে গ্রামের ঘরগুলোর একপাশে বাঁশের মাচা থাকত। মাচার উপর ধানের
মৌসুমে ধান, পাটের মৌসুমে পাট দিয়ে ভরা থাকত। একদিন স্কুল শেষে বাড়ি এসেছি।
মাচার উপরে রাখা ফুটবল আনার জন্য জলচৌকির উপর পা দিয়ে যেইমাত্র মাথা
উঁচু করে তাকিয়েছি, দেখলাম ঐ বিড়ালটা গুণে গুণে পাঁচটা ছানা প্রসব করেছে।
আমার তখন চক্ষুছানাবড়া।
একটা বিড়াল যে এতগুলো বাচ্চা প্রসব করতে পারে তা আমার ধারণার বাইরে ছিল।
মা বিড়ালটা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে,আমি তার বাচ্চাগুলোকে
বোধ হয় নিতে এসেছি।
আমি এ দৃশ্য দেখে ফুটবলটা না নিয়েই মাঠে চলে গেলাম। এরপর প্রত্যেকদিন একবেলা করে আমি মাচার উপর উঠে বিড়ালছানাগুলো দেখি।
কোন দিন দেখি মা বিড়ালের কোলের মধ্যে ছানাগুলো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে,
দুধ খাচ্ছে। আবার কোনদিন দেখি ছানাগুলো নিজেরা নিজেরা কামড়াকামড়ি করে
খেলছে।
তবে প্রত্যেকবারই মাচায় ওঠার সাথে সাথে তা যত নিঃশব্দেই উঠি না কেন, মা
বিড়ালটা কেমন করে যেন টের পেয়ে যেত। আর আমার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকত।
কিছুদিন পর বাচ্চাগুলোকে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে নিয়ে যায়। একে বলে ঘর বদল। সব মা বিড়ালই একাজ করে। জন্মের পর এক ঘরে এক স্থানে রাখেনা।
ঘর বদল করার সময় সাধারণত মা বিড়াল বাচ্চা বিড়ালের ঘাড়ে কামড় দিয়ে এক ঘর
হতে আরেক ঘরে নিয়ে যায়। ঘর হতে বের হয়ে মুখে বিড়ালছানা নিয়ে আরেক ঘরে
যাওয়ার ঠিক সে-সময়ে আমি উঠোন হতে বিড়ালের দিকে এগিয়ে আসি।
শুধুমাত্র আগ্রহী হয়ে। ঠিক এমন সময় বিড়ালছানাকে মুখ থেকে নামিয়ে আমার
দিকে ক্ষিপ্র হয়ে হুংকার ছাড়লো। এমন হুংকার শুনে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে
গেলাম।
আমার মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসলেন। কী সুন্দর দৃশ্য! এক মা তার বাচ্চাকে
বাঁচানোর জন্য হুংকার ছেড়েছেন। আরেক মা তার বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য
রান্নাবান্না ছেড়ে দৌড়ে এসেছেন। দুই মা।
আমি না হয় বিড়ালকে জঙ্গলে রেখে এসেছিলাম বলে, বয়সে ছোট বলে আমার দিকে
ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে কিন্তু আমার মা তো বড়, তাঁকে দেখেও প্রায় দশ
থেকে পনেরো সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বিড়ালটা অদ্ভূত ভঙ্গিতে আওয়াজ করতে থাকলো।
আগ-পিছ চিন্তা না করে মা আমার হাত ধরে ওখান থেকে নিয়ে গেলেন। বিড়ালটা
মনে হয় অদ্ভূত আওয়াজে মাকে বলেছিল, 'তোমার সন্তান তোমার কাছে যেমন প্রিয়,
আমার সন্তান আমার কাছেও প্রিয়।'
মা বুঝেছে আরেক মায়ের বেদনার ভাষা। দোয়া-দরুদ পড়ে আমার বুকে ফুঁ দিয়ে
দিলেন মা। এই লেখাটা আমি লিখছি গাজীপুরের আমার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে
বসে।
চা খাওয়ার নেশা পাওয়াতে লেখা বন্ধ করে চা-স্টলের দিকে রওয়ানা করেছি।
এখানকার ঘরগুলো মাটির তৈরী। উপরে টিনের চালা।বেশ গোছানো। মনে হয়
চলচ্চিত্রের জন্য বানানো সেট।
উঠোন পেরিয়ে যখন বাহির বাড়িতে গেলাম তখন আমি একটা দৃশ্য দেখতে পেলাম।
দৃশ্যটি হলো- একটা মা মুরগী সাথে দশ-বারোটা ছোট ছোট বাচ্চাসহ মাটিতে টুকে
টুকে খাবার খাচ্ছে।
হঠাৎ মা মুরগীটা তিন-চার বার কক কক করে উঠলো। তাকিয়ে দেখলাম মাথার উপর একটা চিল ঘুরছে। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাচ্চাগুলো নেই।
মা মুরগীটা তার দু'পাখনার ভিতর বাচ্চাগুলোকে এমনভাবে লুকিয়ে ফেলেছে যে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
পৃথিবীর সব সন্তানের নিরাপদ আশ্রয় হলো মায়েদের বুক। নিজের জীবন বাজি
রেখে সন্তানের ভালোর জন্য মায়েরা কত ত্যাগ স্বীকারই না করেন। 'এমন দরদী ভবে
কেউ হবেনা আমার মা গো।' পৃথিবীর সব মায়েদের জন্য ভালোবাসা।
পুনশ্চঃ চুরি করে খাওয়ার অপরাধে বিড়ালটাকে বনের মধ্যে রেখে এসেছিলাম।
তখন বিড়ালটার পেট দেখে কেউই বুঝতে পারিনি যে, ওর পেটে মাত্র সন্তান বড় হওয়া
শুরু করেছে।
ঘটনার বেশ ক'দিন পর যেহেতু বিড়ালটা বাচ্চা প্রসব করেছিল তার মানে হলো,
যে-বিড়াল কোনদিন কিছু চুরি করে খায়নি সে-বিড়াল হঠাৎ চুরি করে বাড়তি খাওয়া
শুরু করেছিলো নিজের জন্য নয়; পেটের পাঁচ-পাঁচটি বাচ্চার জন্য। আহারে! মা...


একটি মন্তব্য করুন:
0 মন্তব্য: